
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম:
সমস্ত জীবকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এটাই কোন সামান্য পরিমাণ কোন সন্দেহ নেই তবুও মানুষ সেটা নিয়ে একেবারে উদাসীন হয়ে রয়েছে। এমনকি তার এক পা কবরে রয়েছে এবং এক পা জমিনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে বলেন:
کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ؕ وَ اِنَّمَا تُوَفَّوۡنَ اُجُوۡرَکُمۡ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ فَمَنۡ زُحۡزِحَ عَنِ النَّارِ وَ اُدۡخِلَ الۡجَنَّۃَ فَقَدۡ فَازَ ؕ وَ مَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ
সমস্ত জীবই মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করবে; এবং নিশ্চয়ই উত্থান দিনে তোমাদেরকে পূর্ণ প্রতিদান দেয়া হবে; অতএব যে কেহ জাহান্নাম হতে বিমুক্ত হয় এবং জান্নাতে প্রবিষ্ট হয় – ফলতঃ নিশ্চয়ই সে সফলকাম; আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতীত আর কিছুই নয়। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
জীবনে যত ধরনের বাজি করি না কেন কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবনে একটি বিষয় রয়েছে যেটা আমাদের একেবারে লক্ষ্য রাখা দরকার সেটা হচ্ছে আমরা যতদিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকি না কেন আমাদের কর্ম সেটা ভালো হোক কিংবা মন্দ, নেকি কিংবা গুনাহ, ভালো কাজ কিংবা খারাপ কাজ সেটা আল্লাহর কাছে ধাপে ধাপে পৌঁছে যায়।।
মানবের আমল বা কর্মসমূহ আল্লাহ তায়ালার দরবারে চারটি পৃথক পর্যায়ে পেশ করা হয়ঃ
প্রথমত: দৈনিক (Daily)
দ্বিতীয়ত: সাপ্তাহিক (Weekly)
তৃতীয়ত: বাৎসরিক (Annual / Yearly)
চতুর্থত: একবারেই সমগ্র জীবনের (One-time / Entire Life) — যা হবে কিয়ামতের দিনে।

দৈনিক আমল পেশ
সময়সূচি: প্রতিদিন দুইবার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়ঃ
রাতের আমল: সূর্যোদয়ের আগে (ফজরের পূর্বে) পেশ করা হয়।
দিনের আমল: সূর্যাস্তের আগে (আসরের পূর্বে) পেশ করা হয়।
মূল সময় ও তাৎপর্য (ফজর ও আসর): দিনে ও রাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই দল ফেরেশতা ফজর ও আসরের সময় একে অপরের সাথে পরিবর্তন করে।
তারা আল্লাহর কাছে আরোহন (উর্ধ্বগমন) করে, তখন আল্লাহ জিজ্ঞাসা করেন:
“তোমরা আমার বান্দাদের কী অবস্থায় রেখে এসেছ?”
সর্বোত্তম সাক্ষ্য: ফেরেশতারা উত্তর দেন যে, আমরা তাদের নামাজরত অবস্থায় পেয়েছি ও নামাজরত অবস্থায়ই রেখে এসেছি।
গুরুত্ব: ফজর ও আসরের নামাজ বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কারণ—ফজর সময় ঘুম ত্যাগ করতে হয়, আর আসর সময় মানুষ সাধারণত পার্থিব ব্যস্ততায় নিমগ্ন থাকে।
সাপ্তাহিক আমল পেশ
হাদীসে বলা হয়েছে সোমবার ও বৃহস্পতিবারে। হাদিসে এসেছে, এই দুই দিন রাসুল (সা.) রোজা রাখতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা মতে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার (আল্লাহ তায়ালার কাছে) আমল পেশ করা হয়। তখন আল্লাহ তায়ালা তার মুমিন বান্দাদের ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যে দুই ব্যক্তির পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ আছে, তাদের ক্ষমা করা হয় না। ’ (মুসলিম, তিরমিজি)
সময়সূচি: আমল প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবারে আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।
তাৎপর্য: হযরত মুহাম্মদ ﷺ এই দুই দিন রোযা রাখাকে পছন্দ করতেন, যাতে তাঁর আমল পেশ হওয়ার সময় তিনি রোযাদার অবস্থায় থাকেন।
এই দুই দিনে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের আমল মাফ করে দেন, কিন্তু যারা একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ, হিংসা বা শত্রুতা (হিস্সাহ) পোষণ করে, তাদের ক্ষমা করা হয় না যতক্ষণ না তারা পরস্পর মিলিত হয়।
বাৎসরিক আমল পেশ
উসামা ইবনে যায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, ‘রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস । কিন্তু মানুষ এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। এ মাসে আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। অতএব আমি চাই, আমার রোজাবস্থায় আল্লাহর কাছে আমার আমল পেশ করা হোক। (নাসাঈ)
সময়সূচি: আমল পেশ করা হয় শা‘বান মাসে — যা রজব ও রমজান মাসের মধ্যবর্তী মাস।
তাৎপর্য: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষ সাধারণত এই মাসের মাহাত্ম্য সম্পর্কে গাফেল (অবহেলিত) থাকে। তিনি এই মাসে অধিক রোযা রাখতেন, যাতে তাঁর বাৎসরিক আমল পেশ হওয়ার সময় তিনি রোযার অবস্থায় থাকেন।
একবারের (চূড়ান্ত) আমল পেশ
وَ وُضِعَ الۡکِتٰبُ فَتَرَی الۡمُجۡرِمِیۡنَ مُشۡفِقِیۡنَ مِمَّا فِیۡہِ وَ یَقُوۡلُوۡنَ یٰوَیۡلَتَنَا مَالِ ہٰذَا الۡکِتٰبِ لَا یُغَادِرُ صَغِیۡرَۃً وَّ لَا کَبِیۡرَۃً اِلَّاۤ اَحۡصٰہَا ۚ وَ وَجَدُوۡا مَا عَمِلُوۡا حَاضِرًا ؕ وَ لَا یَظۡلِمُ رَبُّکَ اَحَدًا
এবং সেদিন উপস্থিত করা হবে ‘আমলনামা এবং তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তুমি অপরাধীদেরকে দেখবে আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবেঃ হায়! দুর্ভোগ আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! ওটাতো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয়নি, বরং ওটা সমস্ত হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে; তোমার রাব্ব কারও প্রতি যুলম করেন না। (সূরা কাহফ: আয়াত ৪৯)
সময়সূচি: সমগ্র জীবনের আমল কিয়ামতের দিন (ইয়াওমুল কিয়ামাহ) একবারেই পেশ করা হবে।
তাৎপর্য: তখন সম্পূর্ণ আমলনামা (কর্মের বই) প্রকাশ করা হবে।
কুরআনে বলা হয়েছে, সেই রেকর্ডে ছোট বা বড় কিছুই বাদ থাকবে না; প্রত্যেকে নিজের সমস্ত কাজ নিজের সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে। সেদিন আল্লাহ তায়ালা কারও উপর অন্যায় (জুলুম) করবেন না।
