আধুনিক ফিতনার যুগে যুবসমাজ: আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বাস্তবতা ও করণীয়
ভূমিকা
বর্তমান সময়কে যদি এক কথায় বর্ণনা করতে হয়, তবে তা হবে ফিতনার সময়। এমন এক যুগ, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, হালাল ও হারাম একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যুবসমাজ। যুবকরাই জাতির ভবিষ্যৎ, অথচ আজ তারাই সবচেয়ে বেশি আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বাস্তব চিত্র
এক সময় ছিল, যখন ফজরের আযানে মানুষের ঘুম ভাঙত। আজ অনেক যুবকের ঘুম ভাঙে মোবাইলের নোটিফিকেশনে। নামাজের সময় হলেও হাত চলে যায় ফোনের দিকে। কুরআন তিলাওয়াতের জন্য সময় নেই, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটিয়ে দেওয়া যায়।
একজন যুবক দিনের শুরু করে মোবাইল স্ক্রল করে, আর রাত শেষ করে একইভাবে। মাঝখানে আল্লাহর জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে যায়। এটি কোনো কল্পনার কথা নয়, এটি আমাদের চারপাশের বাস্তব চিত্র।
আধুনিক ফিতনার রূপ: চোখে দেখা কিন্তু বুঝে না ওঠা
আগেকার যুগে ফিতনা ছিল প্রকাশ্য। মানুষ জানত কোনটা গুনাহ। কিন্তু আজকের ফিতনা সূক্ষ্ম। বিনোদনের নামে অশ্লীলতা, স্বাধীনতার নামে সীমালঙ্ঘন, আর আধুনিকতার নামে দ্বীনি মূল্যবোধকে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগুনের মতো নয়, বরং ধোঁয়ার মতো ফিতনা। আগুন দেখলে মানুষ দূরে সরে যায়, কিন্তু ধোঁয়া ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়া ঠিক তেমনই। প্রথমে সামান্য বিনোদন, এরপর সময় নষ্ট, তারপর চরিত্রের অবক্ষয়, আর একসময় ঈমানের দুর্বলতা।
যুবসমাজ কেন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত
যুবসময় আবেগের সময়। এই সময়েই মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। আজকের যুবক সঠিক গাইডলাইন না পেলে সহজেই ভুল পথ বেছে নেয়।
যেমন, একজন ছাত্র পড়ার টেবিলে বসে আছে। বই খোলা, কিন্তু মন নেই। বারবার মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে। পড়াশোনার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে, নামাজ কাজা হচ্ছে, আর অন্তর ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি ব্যক্তির গল্প নয়, বরং হাজারো যুবকের বাস্তবতা।
আল্লাহ থেকে দূরে গেলে কী ঘটে
আল্লাহ থেকে দূরে গেলে শান্তি থাকে না। বাহ্যিকভাবে সুখী মনে হলেও অন্তরে অস্থিরতা কাজ করে। এজন্যই আজ আত্মহত্যা, হতাশা ও মানসিক চাপ বেড়েই চলেছে। মানুষ সবকিছু পেয়েও শান্তি পাচ্ছে না, কারণ শান্তির উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকীর্ণ।”
এই আয়াত আজকের সমাজে অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
করণীয়: ফিরে আসার পথ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। আল্লাহর দরজা আজও খোলা।
প্রথমত, নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, ভালো সঙ্গ বেছে নিতে হবে, কারণ সঙ্গই মানুষকে গড়ে বা ভাঙে।
চতুর্থত, পরিবারকে দ্বীনি পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
পঞ্চমত, যুবকদের সামনে নেককার রোল মডেল তুলে ধরতে হবে।
একটি সুন্দর উদাহরণ হলো, যেমন একটি ঘড়ি ঠিক রাখতে হলে প্রতিদিন সময় মিলিয়ে নিতে হয়। তেমনি ঈমান ঠিক রাখতে হলে নিয়মিত কুরআন, নামাজ ও আল্লাহর স্মরণের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে হয়।
প্রান্তীয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা সর্বশেষ যেটা বলতে চাই,
আধুনিক ফিতনার এই যুগে ঈমান নিয়ে বেঁচে থাকা সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। আল্লাহর দিকে এক কদম এগোলে আল্লাহ আমাদের দিকে বহু কদম এগিয়ে আসেন। এখনই সময় নিজেকে প্রশ্ন করার—আমি কি আল্লাহর দিকে এগোচ্ছি, নাকি ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছি?
আল্লাহ আমাদের যুবসমাজকে হেফাজত করুন, সঠিক পথের দিশা দিন এবং ঈমানের ওপর দৃঢ় থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
